Main Menu

মিরপুরে আজ ক্রিকেটের ‘এল ক্লাসিকো’

পাকিস্তানের এক বিখ্যাত দৈনিক প্রায় আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। সাধারণত সংবাদপত্রে বিশেষজ্ঞের কলামে এসব বেরোতে দেখা যায়। যেখানে বিশেষজ্ঞ লিখবেন, কে কোথায় এগিয়ে, জিততে গেলে কাকে কী করতে হবে। কিন্তু দৈনিকটি সে সবের রাস্তাতেই যায়নি। রীতিমতো রিসার্চ করে নিজেরাই চারটে হাইওয়ে দেশজ টিমের কাছে খুলে দিয়েছে। প্রত্যেকটা জায়গা ধরে, প্রতি ইঞ্চি-সেন্টিমটারের বিশ্লেষণে ঢুকে।

এক, নাম দেখো না, প্রতিভা দেখো। ওপেনিংয়ে মোহাম্মদ হাফিজের সঙ্গে শার্জিল খানের মতো কাউকে নামাও। দুই, প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ভয় পাওয়াও স্পিনে, পেসে নয়। মিরপুরে গত দশ ম্যাচের রেকর্ড বলছে, তাদের বিরুদ্ধে স্পিনাররা উইকেট বেশি তুলেছে। তিন, পাওয়ার-প্লে-তে ঠুকঠুক বন্ধ করতে হবে। ও সব করলে কুড়ি ওভারে জীবনে ১৭০ উঠবে না। চার, ফিল্ডিংকে ভদ্রস্থ করো। মোক্ষম সময় কাউকে ছেড়ো না। এবং সব শেষে ফুটনোট- এই চারটে রাস্তা আমরা দিলাম। ধরে চলতে চেষ্টা করো। ওদের বিরুদ্ধে জিততে হবে বুদ্ধি দিয়ে। শক্তি দিয়ে নয়।

ওদের- অর্থাৎ কাদের, বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আদি ও অকৃত্রিম মহাশত্রু- ভারত!

এত পর্যন্ত পড়লে বিষয়বস্তুও বোধগম্য হওয়া উচিত। লেখালেখিটা অবশ্যই আজকের মিরপুর মহাযুদ্ধ নিয়ে হচ্ছে। এবং যদি ভাবেন লেখালেখিটা এক তরফা চলছে তা হলে একশোয় আপনার স্কোর আপনি ‘মাইনাসে’ দৌড়োচ্ছে। ওয়াঘা সীমান্তের জবাবি তলোয়ার ভারতে এক ওয়েবসাইট। যারা শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে বাজারে ছেড়ে দিল, শনিবারের ম্যাচ নিয়ে কেন পাকিস্তানের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে থাকবে। কারণ বিরাট কোহলি বলে ভারতীয় জার্সিতে যিনি নামবেন, তার ব্যাটের নাকি একটু বেশিই ‘পাকিস্তান-প্রীতি’ আছে। তা এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচে কোহলি রান পান চাই না পান, কিছু যায় আসে না!

আসলে কোনো কোনো ঘটনা মনুষ্য মননকে প্রভাবে এতটা আচ্ছন্ন করে ফেলে যে, আবেগের ঘূর্ণাবর্তের কাছে যাবতীয় যুক্তিবোধ নিথর হয়ে যায়। ব্রাজিল সমর্থকদের আজও ম্যাচের দিন দেখলে আর্জেন্টিনীয়দের কেউ কেউ নাকি বাঁদরের অবিকল অনুকরণ করে ডাকাডাকি করে থাকেন। ঠিক তেমনই এখানে উদাত্ত পাক সমর্থনের মুখ চাচা হলে গ্যালারির কোথাও না কোথাও সুধীর গৌতম নামক প্রত্যুত্তরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে। জাতীয় পতাকায় নিজেকে রাঙিয়ে, বুকে টেন্ডুলকার লিখে, হাতে ভারতের বিশাল পতাকা নিয়ে। দু’টোই প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং যুদ্ধের তীব্রতায় মিলেমিশে এক। ভারত-পাকিস্তান মানে কেউ শুনতে চাইবে না, অতীতে পেরেছেন বলে আজও কোহলির একক পাক-বধের কোনো গ্যারান্টি নেই। ভারত-পাকিস্তান মানে কেউ ভাবতে চাইবে না, মহান অনিশ্চয়তার খেলায় ওই চার রাস্তাতে হাঁটলেও শেষ পর্যন্ত জয় না-ও আসতে পারে। ভারত-পাকিস্তান মানে সবাই ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞ। প্রত্যেকের কাছে জয়ের একটা করে আদর্শ রাস্তা আছে। মানলে ভালো, নইলে গিলোটিন।

সঙ্গে জুড়তে হবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপের পর গত ডিসেম্বরই দু’দেশের দেখা হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। শনিবারের এশিয়া কাপ যুদ্ধ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে হয়নি। আর দেশবাসীর অসীম প্রত্যাশার চাপ, নানাবিধ অঙ্কের জটিলতাতেই কি না কে জানে, শুক্রবার দু’টো টিম পাশাপাশি নেট করেও কেউ কারও সঙ্গে কথাই বলল না।

ফতুল্লায় শুক্রবার দু’টো টিমের পাশাপাশি নেট সেশন ছিল। দু’টো দু’টো করে চারটে নেটে। যা ভারত-পাকিস্তান ভাগাভাগি করে নিল, কিন্তু ঝাড়া আড়াই ঘণ্টার সেশনে কোনো পক্ষকেই প্রীতিসূচক আদানপ্রদান করতে দেখা যায়নি।

সাংবাদিক সম্মেলনও গরম-গরম হয়েছে। পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিদ আফ্রিদি দু’দেশের রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে মুখ খোলা ছাড়াও বুঝিয়ে গিয়েছেন যে, পাওয়ার প্লে-তে ভারতীয় ব্যাটিংকে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো রণসজ্জা তার তৈরি। ওয়াহাব রিহাজ-মোহাম্মদ আমেররা তৈরি হচ্ছেন। ভারতও ঝাঁঝালো। রোহিত শর্মাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমিরকে নিয়ে। যিনি ক্রিকেট নির্বাসন কাটিয়ে ফিরেছেন কিছু দিন আগে। ক্রিকেটবিশ্ব যাঁর বোলিং দেখতে অসীম আগ্রহী। বিরাট দিন কয়েক দিন আগে আমিরের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ভালো ভালো কথা বলে গেলে কী হবে, রোহিত সে সবের পাশ দিয়েই গেলেন না। ‘‘আমরা একা আমির নিয়ে ভাবছি না। আর আমি কিন্তু ওকে আগেও খেলেছি,’’ বলে গেলেন রোহিত।

ছোটখাটো একটা শাসানি প্রায়। এমনিতে ওয়াসিম আকরামের মতো অনেকেই ম্যাচ নিয়ে ইতিমধ্যে বলতে শুরু করেছেন, পাকিস্তান পারবে না। ভারতের যা ব্যাটিং শক্তি, সর্বোপরি টিমটার যা ফর্ম চলছে, তাতে এই পাকিস্তানের পক্ষে মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের সামলানো সম্ভব নয়। সুনীল গাভাস্কারও বলে দিয়েছেন, পাকিস্তানের পেস-আক্রমণ নিয়ে হইচই বাঁধানো অর্থহীন। ‘‘পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণ নিয়ে ভেসে না যাওয়াই ভালো। নতুন বলে কিন্তু ভারতীয় আক্রমণও যথেষ্ট ধারালো,’’ বলে দিয়েছেন লিটল মাস্টার। সঙ্গে আরও জুড়েছেন, ‘‘আর ভারতীয় বোলিং সামলানোর ক্ষমতা ওদের যা আছে, তার চেয়ে ওদের বোলিংয়ের মোকাবিলা করার বেশি ক্ষমতা আমাদের আছে।’’

আপাত-দৃষ্টিতে একশো শতাংশ ঠিক। খাতায়-কলমে ধোনিরা অনেক এগিয়ে। শুধু তিনটে খচখচানি। এমএসডিকে শুক্রবার প্র্যাকটিসে দেখা যায়নি। এশিয়া কাপের সম্মুখসমরে দু’পক্ষ এখনও সমান-সামন। ভারত: ৫-পাকিস্তান: ৫। এবং টিম পাকিস্তান, যারা চলমান অনিশ্চয়তা। কবে ডুববে, কবে ভাসবে কেউ জানে না। তা ছাড়া এ সব ম্যাচে সব সময় ফেভারিট জেতে নাকি?

তার চেয়ে বোধহয় শুধু উত্তাপ উপভোগ করা ভালো। গোটা বিশ্বের বিভিন্ন টুর্নামেন্টের মতো এশিয়া কাপের ভারত-পাকিস্তানেও তো কম রোমাঞ্চ নেই। এই টুর্নামেন্টেই পাক বোলিংকে ফালাফালা করে বিরাট কোহলির ১৮৩ আছে। আবার রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে পরপর ছক্কা মেরে শাহিদ আফ্রিদির পাকিস্তানকে এক উইকেটে জেতানোর ইতিহাসও আছে। তাই বোধহয় তর্কের তীব্রতায় না পুড়ে আরও এক রোমাঞ্চের আশাবাদে ডুবে যাওয়া ভালো।

আজ আবার ভারত-পাকিস্তান। আজ আবার ক্রিকেটের চিরন্তন ‘এল ক্লাসিকো’।






Related News

Comments are Closed