Main Menu

তনু হত্যা: ধর্ষক ও খুনীর সর্বোচ্চ শাস্তি হোক

এহসান বিন মুজাহির: হত্যা-গুম ধর্ষণ এগুলো এখন তেমন বড় কোনো বিষয় না। খুন ধর্ষণ দুর্নীতি এখন দেশের নিত্ত-নৈমত্তিক রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দৈনিকের পাতাসহ বিভিন্ন পোর্টালে চোখ বুলালেই দুর্নীতি খুন-ধর্ষণ, ধর্ষণত্তোর নৃশংস হত্যার খবর চোখে পড়ে। মানুষ নামী হায়েনাদের হিংস্র ছোবল থেকে ৩ বছরের শিশু এমনকি পেঠের বাচ্চারা রক্ষা পাচ্ছে না। নারীদের কথা বাদই দিলাম। সস্প্রতি তনুর ঘটনাই দিয়ে আজকের নিবন্ধনের সুচনা।
গত ২০ মার্চ রোববার ময়নামতি সেনানিবাসের অলিপুর এলাকায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ ও হত্যার নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ময়নামতি সেনানিবাস এলাকায় অলিপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তনু ছিলো মেজো। পরিবারের অস্বচ্ছলতার কারণে তনু পাড়াশোনার পাশিপাশি বাসার কাছে অলিপুর গ্রামেই এক বাসায় টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে আসছিলো। হত্যা ও ধর্ষনের দিন তনু ২০ মার্চ বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে প্রতিদিনের মতো ঘর থেকে বের হয়। বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইলে যোগাযোগ করে, কিন্তু পায়নি। যে বাসায় টিউশনি করতো সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ওই বাসা থেকে বের হয়ে গেছে সে। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ময়নামতি সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাওয়ার হাউসের পানির ট্যাংক সংলগ্ন স্থানে তনুর মৃতদেহ পাওয়া যায়। গলাকাটা মৃতদেহ নগ্ন অবস্থায় কালভার্টের পাশে ঝোপঝাড়ের ভেতর পড়েছিলো। নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিলো। মোবাইল ফোনটিও পড়েছিল পাশে। খবরটি প্রথম সারির জাতীয় কোনো দৈনিকে তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। তনুর পরিবার এ ঘটনায় মামলা করলেও পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে মিডিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে বলেও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এসব ঘটনায় তনুর ধর্ষক ও হত্যাকারীদের সনাক্ত ও বিচার প্রক্রিয়া থেকে আড়াল করার কোনো অপচেষ্টা আছে কি না সে নিয়ে জনমনে বড় সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
তনুর জীবনে যা ঘটেছে চিত্রায়িত করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এটা যখন লিখছি তখন দু’চোখ বেয়ে টিপ টিপ করে পানি ঝরছে। আহ! সোহাগী জাহান তনুর ছবিটা যতবারই ফেসবুকে দেখি ততবার কলিজা ছিঁড়ে যায়, বুক ভেঙে আসে। নৃশংস ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আজ অভিধানে পরাজিত। আমি হতবাক, লজ্জিত, নির্বাক, স্তব্ধ।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ছিলেন সোহাগী জাহান তনু। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে টিউশনি করে নিজের পড়ালেখা চালাতেন। তার উপার্জনের মাধ্যমে পরিবার চলতো। অন্যান্য দিনের ন্যায় ২০ মার্চ বিকেলে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনিতে গিয়েছিল সোহাগী। সেদিন টিউশনির বাসা থেকে বের হলো ঠিকই, কিন্তু অক্ষত অবস্থায় আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। তার আগেই মানুষরূপী হায়েনার হিংস্র ছোবলে পড়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হলো তাকে। মানুষ এতো নিষ্টুর!
কুমিল্লার সেনানিবাস এলাকায় ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রী তনুকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদমুখর ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমগুলো। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে শুরু করে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সারা দুনিয়ায়। দেশের সচেতন এমনকি অনেক বিদেশি বাংলাদেশীরা এবিষয়ে অনলাইনে প্রতিবাদে সোচ্চার। তারাও ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস-কমেন্টে এঘটনার তীব্র নিন্দা, ঘৃণা আর ধিক্কার জানিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন । পাশাপাশি দ্রত ধর্ষকদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তুলেছেন। ইতোমধ্যে কুমিল্লা, রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন-মিছিল ও বিভিন্ন সংগঠন ও নারীনেত্রীরা বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তনুর নৃশংস খুনের কথা যতবার মনে হয় ততবার আমার চোখ ভিজে আসে, দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হয়। বুকটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে যায়। তনুরাও কখনও মরে না। ইতিহাস হয়ে যায়। আর ঐসকল নরপশুরা ক্ষমতার দাম্ভিকে বুক ফুলিয়ে বেচেঁ থাকলেও একদিন বিষাক্ত কীটের মতো পচেঁ গলে মরে। তনুর নৃশংস খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় এটাই আবার প্রমাণিত হলো যে দেশের নারীরা ঘরে-বাইরে-অফিস-আদালত-পথে-ঘাটে-বাসে তথা কর্মক্ষেত্রে কোথাও নিরাপদ নয়। সেনানিবাসের ভেতর, যেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা আছে বলে ধারণা করা হয়, এখানকার সেনারা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাজে নিয়োজিত সেখানে নারী ধর্ষণ ও হত্যার মতো অমানবিক, ঘৃণ্য ঘটনা ঘটে কিভাবে? একথা সবার জানা যে, দেশের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। আর এ এলাকার মধ্যেই মানষরুপী নরপশুরা ঝাপিয়ে পড়লো তনুর উপর। নিষ্পাপ শরীরটাকে ধর্ষণ করল বিভৎসভাবে। এতেও নরশুদের মিটল না ক্ষুধা। গলা কেটে নৃশংসভাবে খুন করলো ক্যান্টনমেন্ট সীমানার ভেতরেই। সেনানিবাস এলকায় সাধারণত সর্বসাধারণের চলাফেরা নিষেধ। যারা প্রয়োজনে আসা-যাওয়া করে, সেই সংখ্যাও খুব সীমিত। বিশেষ কোন প্রয়োজনে সেনানিবাস এলাকায় কেউ যদি যাতায়াত করে থাকে তাহলে এবিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য থাকে। কুমিল্লা সেনানিবাসে সোহাগীকে আসলে কে বা কারা ধর্ষণ করে হত্যা করেছে অপরাধী শনাক্ত না করা পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। তবে সেনানিবাস এলাকায় কোনো নারী ধর্ষিত বা খুন হলে সংশ্লিষ্ট কেউই সেই দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না। যদি বিষয়টি এমন হয় যে রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায়, তখন আর জনসাধারণের কিছু করার থাকে না। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে।
সরকাররের বড় ব্যর্থতা মানুষের জানমালের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। এদেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার। অতীতের সকল ঘটনার বিচার ও উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ধর্ষণ-নিপীড়ন বন্ধ হচ্ছে না। এমনকি ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যৌনসন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। ডিজিটালভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ধর্ষণ, গুম, খুন ও দুর্নীতিতে। দেশে আইন আছে যথাযথ প্রয়োগ নেই। যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হত তাহলে এদেশে একের পর এক ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার মতো জঘন্য কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটতো না। দিন দিন ধর্ষণের সংস্কৃতি বাড়ছে তো বাড়ছেই। এর একমাত্র কারণ প্রকৃত দোষী-খুনী, ধর্ষক তথা অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দেয়া। দেশে ঘটে যাওয়া প্রতি খুন-ধর্ষণের যথার্থ বিচার তথা দোষীদের সর্বেচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করলে এমনটি আর ঘটতো না।
পরিশেষে অবিলম্বে সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষক ও হত্যাকারীদের সনাক্ত করে আটক ও উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি সরকারের প্রতি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






Related News

Comments are Closed