Main Menu

রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের দিন আজ

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই- নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’। নিঃশেষে দান করা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত, বাঙালি জাতির চির অহঙ্কার ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতার ৪৫তম বর্ষপূর্তি আজ। স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালিদের একটি গৌরবময় দিন স্বাধীনতা দিবস। এ দিবসটি বিশ্বের সমগ্র বাঙালি জাতি আনন্দ ও উৎসব মূখর পরিবেশে পালন করছে। এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ হয়েছে, ৭১’র মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে। ইতোমধ্যে শীর্ষ ৪ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। তাতে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্যদের অনেকটাই মনোকষ্টের অবসান হয়েছে। আরও ক’জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের চুড়ান্ত ও সর্বোচ্চ রায়ের অপেক্ষায় সারা জাতি। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৭১ সালের এ দিনেই নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণ-হত্যা চালিয়ে বর্বরদের চেয়েও বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এর পরবর্তী দু’মাস পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা ধ্বংস যজ্ঞের পাশা পাশি পাল্টা হিসেবে শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধ ও রণ প্রস্তুতি। কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র। চিহ্নিত কিছু কুলাঙ্গার ও স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে যার যা কিছু ছিলো তা নিয়েই হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য সমর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। প্রতিটি স্বাধীনচেতা বাঙালির প্রতিজ্ঞা ছিল দেশ পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে মুক্ত করে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার। দুচোখ ভরে স্বপ্ন ছিলো স্বাধীন দেশে থাকবে না কোনো অন্যায় অত্যাচার, দুর্নীতি, ক্ষুধা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। বাংলা মায়ের মুক্তিকামী সূর্য সন্তানরা মাত্র ৯ মাসের মধ্যে দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত ও ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙ্গালি জাতির জীবনে এক বিভীষিকাময় রাত নেমে আসে। বলা নিস্প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ হৃদয়ে ধারণ করে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এ অগ্নিঝরা পঙতিটিই বাস্তবতার ধারায় রক্ত ঝরা মহান মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, তৎকালীন ইপিআর (বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি) ও ছাত্র-জনতা সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এ ঘোষণায় মহান মুক্তিযুদ্ধকে আরও বেগবান করে আর তখন থেকেই শুরু হয় সমরযুদ্ধ। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘদিন নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা থাকলেও বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে নানান ভাবে তাঁরা জানতে পারছে। রক্তাক্ত ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ ও ইতিহাস নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক দলিল রচিত হয়েছে।

এ গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে বিশ্ব দরবারে চলছে নানান গবেষণা। দিকে দিকে আজ নতুন প্রজন্ম মহান স্বাধীনতার মূল চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শপথ নিচ্ছে। সর্ব যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতিক জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্যে। তিনি চেয়েছিলেন, এ দেশের মানুষকে পাকিস্তানিদের রোষানল, পৈশাচিকতা, স্বজনপ্রীতিসহ সব ধরণের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে। তাঁর প্রথম স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হয়েছে। দেশের মানুষকে পকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী স্বাধীনদেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করে অন্যান্য স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিয়ে বেশীদূর এগুতে পারেননি তিনি। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্তকারীরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বাদে মহান পুরুষ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারের হত্যা করে। দুঃখ জনক হলেও সত্যি, দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৫ বছরের মাঝে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আদলে সামরিক শাসনের দুঃসময়ে নিয়ে গিয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৮ জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর থেকে দেশ সামরিক বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে। তাঁর নেতৃত্বে দেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহদ রয়েছে। সোনার বাংলায় আর কখনও কোনো ধরণের রাজনৈতিক সহিংসতা এক মূহূর্তের জন্যেও মেনে নিতে প্রস্তুত নয়- অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন বীর বাঙালি। জাতির প্রত্যাশা আজ ৪৫তম মহান স্বাধীনতা দিবসে সকল রাজনৈতিক দলের নতুন করে শপথ এবং অঙ্গীকার করতে হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে, দেশে সুস্থ ধারার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। দেশ থেকে হানাহানি, লুটপাট, হামলা, ষড়যন্ত্রমূলক মামলা, ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও নৈরাজ্য এবং সংঘাত দূর করতে হবে। দেশে বিরাজ করবে গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূল চেতনাকে সামনে রেখে এগুতে হবে। বাঙালি জাতিকে মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেতসহ সারা বাংলায় কিভাবে আক্রমণ করেছিল পাকিস্তানি হায়েনারা। সেদিন হানাদার বাহিনী ট্যাঙ্ক ও মর্টারের গোলার মাধ্যমে নীলক্ষেতসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলি, ট্যাঙ্ক-মর্টারের গোলায় ও আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে উঠেছিল বিভীষিকাময়। তখন পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্রীরাও। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য আর কখনও যেন বাংলাদেশের মাটিতে না ঘটতে পারে। মহান স্বাধীনতা দিবসে সকল রাজনৈতিক মতানৈক্য ভুলে এ জাতিকে স্বনির্ভর, অর্থনৈতিক মুক্তি, শোষণমুক্ত সমাজ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, ৭১’র মানবতাবিরোধী অপশক্তি মুক্ত জাতিতে পরিণত করার দীপ্ত অঙ্গীকার হোক আজ। এ স্বাধীনবাংলা বিশ্ব দরবারে চির দিন মাথা উঁচু করে থাকবে বীরের জাতি হিসেবে এ প্রত্যাশা বিশ্ব বাঙ্গালির। মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছেন, সমর্থন যোগিয়েছেন এবং স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শ ও লক্ষ্যে বিশ্বাসী তাদের যদি এখনও স্বাধীনতার শত্রু বর্বর জঙ্গীবাদীর আঘাতে প্রাণ দিতে হয়, স্বাধীনতার তরী যদি রক্তের ওপর ভাসতেই থাকে, তাহলে এ স্বাধীনতার কী মূল্য রইলো? বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:- বীরের এ রক্তস্রোত. মাতার এ অশ্রুধারা/ এর যতো মূল্য সে কী ধরার ধুলায় হবে হারা ॥ স্বর্গ কী হবেনা কেনা, বিশ্বের ভান্ডারী শোধিবে না এতো ঋণ/ রাত্রির তপস্যা সে কী আনিবে না দিন ॥ ১৯৭১ সালে মুক্তিকামী বাঙালি একটি রণ জয় করেছে, কিন্তু তাঁর রাত্রির তপস্যা অসমাপ্ত রয়েছে। বীর বাঙালিকে তাই এখনও স্বাধীনতাবিরোধীদের অস্ত্রের আঘাতে প্রকাশ্যে রাজপথে ঢালতে হচ্ছে রক্ত, দিতে হচ্ছে প্রাণ, মাকে ঝঁরাতে হচ্ছে অশ্রুগঙ্গা। বিদেশি হানাদার নয়, স্বজাতি ঘাতক ও মৌলবাদী জঙ্গীদের ছুরিকাঘাতে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তের স্রোতে আরও বেশী রক্তধারা মিশে যাচ্ছে। এ রক্তের স্রোতধারা থামাতেই হবে। রাজাকার, মৌলবাদী, জঙ্গীবাদী গোষ্ঠি, স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের মূলোৎপাটন করে কলঙ্ক মুক্ত করতে হবে বাংলা মায়ের আঁচল। মহান স্বাধীনতা দিবসে এই হোক বীর বাঙ্গালির দৃঢ় অঙ্গীকার।






Related News

Comments are Closed