Main Menu

ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল। আবারো শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। কিন্তু এবার মিয়ানমারের মাওলাইক থেকে ৭৪ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্ব দিকে। পর পর কয়েক দফা শক্তিশালি ভূমিকম্পে কেপে ওঠেছে ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ মিয়ানমার। যার ধাক্কা ভালো ভাবেই লেগেছিলো বাংলাদেশে। আঘাত হানা ভূমিকম্পে কেপে ওঠে বাংলাদেশও। তাই প্রতিবেশি দেশগুলোর ভূমিকম্পের আঘাত বাংলাদেশেও ঝুঁকি বাড়ছে।

১৩ এপ্রিলের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের মাউলাইক শহরের ৭৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ দশমিক ২ বললেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউএসজিএসের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৯।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ৭ দশমিক বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তাদের। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণসহ বেশকিছু কারনে এই ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বড় ক্ষতির আশংকাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পলিমাটির দেশ নামে খ্যাত এই বাংলাদেশের অবস্থান এমনই তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে, যার মধ্যে ভারত অংশের প্লেট ছাড়াও উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট আর পূর্বে রয়েছে বার্মা প্লেট। ভারত ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলটা আবার বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে গেছে। তাই ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশ রয়েছে ভূ-কম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্থ অবজারভেটরি’র পরিচালক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘প্লেট টেকটনিক যে কাঠামো রয়েছে এইটাই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ অত্যন্ত ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা এবং ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

অন্যদিকে, নগরায়ণের প্রভাবে ক্রমেই বাড়ছে রাজধানী ঢাকার আয়তন, বাড়ছে জনবসতি। বিল্ডিং কোড না মেনে আবার কখনও অনুমতির তোয়াক্কা না করে কংক্রিটের অট্টালিকা উঠছে আকাশ মুখে। প্রশ্ন হচ্ছে, নেপালের মতো ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প যদি ঢাকার আশেপাশেও আঘাত হানে তাহলে কী হবে এই মেগা সিটির?

বুয়েটের গবেষকদের ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৪৩ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে (জোন-১), ৪১ শতাংশ এলাকা মধ্যম (জোন-২) ও ১৬ শতাংশ এলাকা নিম্ন ঝুঁকিতে (জোন-৩) রয়েছে।

জোন-১ এর মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড়, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সম্পূর্ণ অংশ, এবং ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের অংশবিশেষ। রাজশাহী, নাটোর, মাগুরা, মেহেরপুর, কুমিল্লা, ফেনী ও ঢাকা রয়েছে জোন-২ এ অধীনে। জোন-৩ এর মধ্যে রয়েছে বরিশাল, পটুয়াখালী, এবং সব দ্বীপ ও চর। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঝুঁকি কমাতে পরিকল্পিত ভবন নির্মাণের বিকল্প নেই। সেজন্য এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
বাংলাদেশ আর্থ কোয়াক সোসাইটি’র সাবেক সভাপতি ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এই ধরনের ভূমিকম্প বাংলাদেশে হলে এক লাখের মতো লোক প্রাণ হারাতে পারে। আর ঢাকার কাছাকাছি হলে ঢাকা একটা বিধ্বস্ত মহানগরীতে পরিণত হবে।’

পূর্বাভাসের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা আবিষ্কৃত না হওয়ায় একমাত্র সচেতনতাই হতে পারে বাঁচার পথ, এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। তবে জাপানের আদলে মোবাইলে ভূ-কম্পনের এলার্ট সার্ভিসের সুযোগ রাখা যায় কি না এমন চিন্তার খোরাকও দিয়েছেন অনেকে।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, বলেন, জাপানে স্মার্ট ফোনে ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে সয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ট দিয়ে দেয়। মিয়ানমার থেকে আমাদের দেশে আসতে বেশ সময় লেগেছে। যদি সেন্সর থাকতো তাহলে সয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের সবাইকে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে দিতো যে একটা ভূমিকম্প আসছে।’

ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে যেমন পূর্বাভাস দেয়া হয় বা পাওয়া যায়, ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি।’
ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পগুলো : ১৮৬৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভয়াবহ বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। এর মধ্যে ৬ থেকে ৬ মাত্রার বেশী তিনটি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল দেশের ভেতরেই।

আবহাওয়া অধিদফতরের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ১৮৬৯ সালের ১০ জানুয়ারি ভারতে (কেন্দ্র) ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এরপর ১৮৮৫ সালে সিরাজগঞ্জে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়।

১৮৯৭ সালের ১২ জুন ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ‘দ্যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ ভারতবর্ষে আঘাত হানে। এটা আজও পৃথিবীর অন্যতম বড় ভূমিকম্প হিসেবে পরিচিত। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ভারতের শিলং শহর। তবে এর প্রভাব বর্তমান বাংলাদেশসহ বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সে সময়ের ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন মিশনারীদের বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়েছিল এই ভূমিকম্পের কারণে। এ ছাড়াও ঢাকায় প্রায় ৪৫০জন মানুষ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।

জানা যায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সৃষ্ট ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিলো ১৮৯৭ সালে আঘাত হানা ৮ দশমিক৭ মাত্রার এই ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প’।
এরপর দেশে ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল।

১৯৩০ সালের ২ জুলাই ভারতে (কেন্দ্র) ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট আসামে হয় ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প। ১৯৫৪ সালের ২১ মার্চ ভারতের মণিপুরে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

ভারতের আসামে (কেন্দ্র) ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয় ১৯৭৫ সালের ৮ জুলাই। ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের সিকিমে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এ ভূমিকম্পের কেন্দ্র বাইরে হলেও তীব্র কম্পন অনুভব করে বাংলাদেশ।

১৯৯৭ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এ ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপ।

মে মাসের মধ্যেই বড় ধরনের ভূমিকম্প:
ভূমিকম্পের সুর্নিদিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া না গেলেও ইদানীং কিছু কিছু আভাস দেওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে ভূতাত্ত্বিক পর্যালোচনা করে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউএসজিএস একটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, আগামী মে মাসের মধ্যে অন্তত একটি বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশসহ আশেপাশের অঞ্চলকে ঝাঁকুনি দিতে পারে। হতে পারে মাঝারি থেকে বড় ধরনের আরও কয়েকটি ভূমিকম্প। নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল দুর্যোগটি হয়েছে কাঠমান্ডু থেকে পশ্চিম দিকে। তারপর কয়েকটি আফটার শক হয়েছে এবং সর্বশেষটি হয়েছে মিয়ানমার, যার মাত্রা ছিল ৬.৯।

সূত্র মতে, ক্রমেই আফটার শকগুলো পূর্ব দিকে সরে এসেছে। আর এর মানেই হচ্ছে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, আমাদের এই অঞ্চলে ২০১৫ সালের ২৬ মে থেকে ২০১৬ সালের ২৬ মের মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ মাত্রার অন্তত একটি, ৬ থেকে ৭ পর্যন্ত অন্তত চারটি এবং ৫ থেকে ৬ পর্যন্ত অন্তত আটটি ভূমিকম্প হবে।






Related News

Comments are Closed