Main Menu

দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে নবরত্ন মন্দিরটি

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যূষিত গ্রাম হাটিকুমরুল। পাখির কোলাহল আর ছায়া সুনিবিড় সবুজে ঘেরা এই হাটিকুমরুল এলাকায় অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির।

জানা যায়, ১৭০৪ থেকে ১৭১৮ সালের মধ্য মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। নবরত্ন মন্দিরের গঠন আকৃতি ও নির্মাণশৈলী এতটাই অভূতপূর্ব যে দেশীয় পর্যটক ছাড়াও জার্মান, জাপান, ফ্রান্স, আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা এখানে ঘুরতে আসেন। তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং মন্দিরের আশপাশের জায়গাগুলো দখলমুক্ত করে পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে নবরত্ন মন্দির হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

নবরত্ন মন্দির এলাকা ঘুরে জানা যায়, মথুরার রাজা প্রাণনাথের বন্ধুভাজন ব্যক্তি ছিলেন জমিদার রামনাথ ভাদুড়ি। রাজা প্রাণনাথ দিনাজপুর জেলার ঐতিহাসিক কান্তজিউর মন্দির নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সংকটে পড়ে যান। এদিকে রামনাথ ভাদুড়ি রাজা প্রাণনাথকে রাজস্ব পরিশোধ করার জন্য চাপ দেন। কিন্তু রাজা প্রাণনাথ বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হলে রামনাথ ভাদুড়ি বন্ধুত্বের খাতিরে নিজ কোষাগার থেকে প্রাণনাথের বকেয়া পরিশোধ করে দেন। বিনিময়ে তিনি রাজা প্রাণনাথকে দিনাজপুরের কান্তজিউর মন্দিরের আদলে হাটিকুমরুলে একটি মন্দির নির্মাণের শর্ত জুড়ে দেন। বন্ধুর দেয়া শর্ত মোতাবেক রাজা প্রাণনাথ কান্তজিউর মন্দিরের অবিকল নকশায় হাটিকুমরুলে এই নবরত্ন মন্দিরটি নির্মাণ করেন। আবার অন্য সূত্রে জানা যায়, রাখাল জমিদার নামে পরিচিত রামনাথ ভাদুড়ি তার জমিদারি আয়ের সঞ্চিত কোষাগারের অর্থ দিয়েই এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

মন্দিরের বিশাল চত্বরে বিক্ষিপ্তভাবে আরও তিনটি মন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের উত্তরে রয়েছে শিব পার্বতী মন্দির, তার পাশেই রয়েছে দোচালা চণ্ডি মন্দির, দক্ষিণ পাশে পুকুরের পাড়ঘেঁষে রয়েছে পোড়া মাটির টেরোকোটা কারুকার্য খচিত শিবমন্দির। এই চারটি মন্দিরেই পূজা অর্চনা করা হতো। তারপর কালের বিবর্তনে ভারত উপমহাদেশে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত, দেশ বিভাগ ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে হারিয়ে যায় জমিদারের পূর্বপুরুষরা।

যুগযুগ ধরে কালের সাক্ষী হয়ে ঝোঁপঝাড় বুকে নিয়ে লুকিয়ে ছিল এই নবরত্ন মন্দিরটি। অরক্ষিত এই নবরত্নের অনেক মূল্যবান প্রাচীনসামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে দেশি-বিদেশি দুর্বৃত্তরা বলে জানা গেছে। পরে স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহ্যের এই নিদর্শন খুঁজে বের করে। বিশেষজ্ঞদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় নবরত্ন মিসরের পিরামিডের মতো ধীরে ধীরে ফিরে পেতে থাকে প্রাচীন ঐতিহ্য ও তার হারানো অপরূপ সৌন্দর্য। এরপর ১৯৮৭ সালে সংরক্ষিত ইমারত হিসেবে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ গ্রহণ করে নবরত্ন মন্দির ও এর আশপাশের মন্দিরের কিছু সংস্কার সাধন করে।

নবরত্ন মন্দির দেখার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শতশত দর্শনার্থী আসেন। দুঃখের বিষয় মন্দিরের কোন প্রাচীর না থাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে দর্শনার্থীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার পায়ে হাঁটা রাস্তা, খানাখন্দে ভরা একটু বৃষ্টি হলেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পর্যটকদের জন্য রাস্তাটা পাকা করা অনেক আগেই জরুরি ছিল। নবরত্ন মন্দিরটির চারপাশে প্রায় ২০০ ঘর হিন্দু পরিবার বসবাস করে। মূল মন্দিরের পাশেই হিন্দুদের পূজা-অর্চনার একটি জড়াজীর্ণ মন্দির রয়েছে। এটিও মূল মন্দিরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মেরামত করা দরকার।

নবরত্ন মন্দিরের চারপাশে জায়গাগুলো দখলমুক্ত করে পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে নবরত্ন মন্দিরটি হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। ফলে সলঙ্গা থানার পরিচিতি ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সরকারের কাছে এটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।






Related News

Comments are Closed