Main Menu

যুদ্ধাপরাধ মামলা: ৩ জনের ফাঁসি, ৫ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে তিন জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বাকি ৫ জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। আজ সোমবার (১৮জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে সকাল পোনে ১১ টায় ২৮৯ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়া শুরু করেন আদালত। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী।এর আগে গত রোববার একই ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য এ দিন ঠিক করেন।

ফাঁসির আদেশপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আশরাফ হোসাইন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও মোহাম্মদ আবদুল বারী। আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- জামালপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অ্যাডভোকেট শামসুল আলম ওরফে বদর ভাই ও সাবেক জামায়াত নেতা এস এম ইউসুফ আলী, অধ্যাপক শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মো. হারুন ও মোহাম্মদ আবুল হাসেম।

গত ১৯ জুন উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। মামলার আট আসামির মধ্যে অ্যাডভোকেট শামসুল হক ও এস এম ইউসুফ আলীকে আজ সকাল ৯ টার দিকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় হাজির করা হয়েছে। পলাতক রয়েছে ছয়জন। তারা হলো আলবদর বাহিনীর উদ্যোক্তা মো. আশরাফ হোসেন, অধ্যাপক শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মো. আবদুল হান্নান, মো. আবদুল বারী, মো. হারুন ও মো. আবুল কাসেম। আসামিদের বিরুদ্ধে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন হত্যা, গণহত্যা,আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও গুমের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।

ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ও তাপস কান্তি বল। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান, ব্যারিস্টার এহসান সিদ্দিকী ও অ্যাডভোকেট এন এইচ তামিম। পলাতক ছয়জনের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবদুস সুবহান তরফদার।

গত বছরের ২৬ অক্টোবর এই আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ২৯ এপ্রিল এ আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২২ জুলাই পলাতক জামালপুরের ছয়জনকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ১৯ এপ্রিল এ আট আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পাঁচটি ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এদের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ গঠন করে বিচার সম্পন্ন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:

প্রথম অভিযোগ: একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও শান্তি কমিটির সদস্য শামসুল হক ও এস এম ইউসুফ আলী ও তাদের অন্য সহযোগীরা তৎকালীন জামালপুর মহকুমায় সাধারণ মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের মতোমানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটনায়। একাত্তরের ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জামালপুরে হত্যা-ধ্বংস চালায়; স্বাধীনতাকামী এক হাজার লোককে হত্যা করে তারা। এ ঘটনায় শামসুল হক ও এস এম ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগ: আসামি আশরাফ হোসেন, শরীফ আহমেদ, আব্দুল মান্নান, মো. হারুন ও আব্দুল বারী ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই এবং ২২ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার মইষ ভাদুরিয়া ও ধূপদহ গ্রামের শহীদআব্দুল হামিদ মোক্তারের বাড়ি, মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়ার বাড়ি, আমির আলী খানের বাড়ি, পিটিআই হোস্টেলের টর্চার ক্যাম্প ও জামালপুর শ্মশান ঘাটে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে।

তৃতীয় অভিযোগ: শরীফ হোসেন, মো. আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান,আব্দুল বারী, আবুল হাশেম, শামসুল হক, এস এম ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১০ জুলাই রাত ৩ টার দিকে আসামি শরীফআহমেদ, আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী, আবুল হাসেম, শামসুল হক, ইউসুফ আলী ও আল-বদর বাহিনীর সদস্য ও শান্তি কমিটির সদস্যরা জামালপুরের সিঅ্যান্ডবি রোডের দয়াময়ী লেনের মল্লিক ভিলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন শহীদ নুরুলআমীনকে অপহরণ করে। তারপর ওইদিন সকাল ১০ টায় তার মরদেহ ব্রক্ষ্মপুত্র নদের চ্যাপতলা ঘাটে ভেসে ওঠে।

চতুর্থ অভিযোগ : শরীফ হোসেন, মো. আশরাফ হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান ও মো. আব্দুল বারীর বিরুদ্ধে আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। জামালপুরে আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে বদর বাহিনী গঠিত হয়, তিনি সে সময় মহকুমা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। জামালপুরের আশেক মাহমুদ ডিগ্রি কলেজকে সে সময় নির্যাতন কেন্দ্র ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো, যার প্রধান ছিলেন আশরাফ হোসেন। আসামি আশরাফ হোসেনের পাশাপাশি আল বদরের সদস্য শরীফ আহমেদও জামায়াতেইসলামীর প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারীসহ অন্যদেরও সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। একাত্তরের ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আসামিরা সেখানে অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যা করেছে।

পঞ্চম অভিযোগ: শরীফ হোসেন, মো. আশরাফ হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. আব্দুল বারী, মো. আবুল হাশেম, শামসুল হক, এস এম ইউসুফআলীর বিরুদ্ধে আটকে রিখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল থেকে১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আসামি শরীফ আহমেদ, আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী, আবুল হাসেম, শামসুল হক ও ইউসুফ আলী এবং স্থানীয় আল বদর বাহিনীর সদস্য ও পাক সেনারা জামালপুরের পিটিআই হোস্টেলকে নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত।সেখানে হাজারখানেক নিরস্ত্র মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো এবং রাতে তাদের ব্রক্ষ্মপুত্র নদের তীরে শ্মশান ঘাটে নিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।






Related News

Comments are Closed