Main Menu

প্রসঙ্গ : দাওয়াত-তাবলিগ

এহসান বিন মুজাহির
নবী-রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে দাওয়াত ও তাবলিগের জিম্মাদারী অর্পিত হয়েছে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর। এ দ্বীনি জিম্মাদারী বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় ৮৮ বছর আগে (১৯২৭ সালে) ভারতের এক জনবিরল অঞ্চল ‘মেওয়াত’ থেকে হাতে গোনা ক’জন মানুষ নিয়ে হজরত মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভী (রহ.) তাবলিগের দাওয়াত ও মেহনত শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে দাওয়াত ও তাবলিগের এ মেহনত এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমারূপে। এ বিশ্ব ইজতেমা ঈমানী মেহনতের ফসল। ১৯৬৭ সালে টঙ্গীর পাগাড় গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব ইজতেমা।

বিশ্ব ইজতেমা সাধারণত বৈশ্বিক বড় সমাবেশের নাম। বিশ্ব ইজতেমা নামে সর্বমহলে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও পরিচিত দাওয়াত ও তাবলিগ জামাতের বার্ষিক বৈশ্বিক সমাবেশ, যা বাংলাদেশের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি আরবের মক্কায় পবিত্র হজের পর টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে আয়োজিত মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম গণজমায়েতই বিশ্ব ইজতেমা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের পাশাপাশি পার্থিব জীবনে সুখ শান্তি অর্জন করতে তাবলিগ জামাতের এই বিশাল গণজমায়েতে অংশগ্রহণ করেন দেশ-বিদেশের লাখ-লাখ মুসলমান। ইজতেমা শব্দটি আরবি, অর্থ মহাসম্মিলন, গণজমায়েত, সমাবেশ।

১৯২৭ সালে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রাহ.) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর এলাকায় দাওয়াত ও তাবলিগের প্রবর্তন করেন এবং একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্মিলন বা ইজতেমারও আয়োজন করেন। বাংলাদেশে ১৯৫০-এর দশকে তাবলিগ জামাতের প্রচলন করেন মাওলানা আবদুল আজিজ। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এই সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়।

১৯৬৭ সাল থেকে প্রতি বছর এই সমাবেশ নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্কসংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তৎকালীন হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে ইজতেমার অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ গ্রহণ করায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৭ সাল থেকে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর তুরাগ নদীর উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ১৬০ একর জায়গায় বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

(সুত্র: উইকিপিডিয়া)

বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে সারাবিশ্বে দ্বীন প্রচারের বিস্তৃত একটি উদ্যান। ইজতেমার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে কালাল্লাও কালা রাসুলুল্লাহর বাণী ও ঈমান-আমলের দাওয়াত সারাবিশ্বে পৌছে দেয়া। তিনদিনের ইজতেমার মাঠে প্রথম দিন বাদ ফজর শুরু হয় আম বয়ান। দেশ-বিদেশেরা আলেমগণ এ বয়ান করেন। এতে ইসলাম, ঈমান-আমল, আকিদা, আল্লাহর সানি্নধ্য লাভের পথ, কোরআন ও হাদিসের আলোকে দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্ব বিষয়ে বয়ান করা হয়। দ্বিতীয় দিন শীর্ষ মুরুবি্বগণ বয়ান করেন। এর ফাঁকে ফাঁকে থাকে জিকির ও নতুন নতুন জামাত গঠন। এ দিনে বাদ আসর অনেক যৌতুকবিহীন বিয়েও অনুষ্ঠিত হয়।

তৃতীয় দিন বাদ ফজর থেকে তাসকিলের কামরার পাশে আখেরি মোনাজাত মঞ্চ থেকে হেদায়তি বয়ান করা হয়। বিশ্ব ইজতেমায় প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, চীন, জাপান, কুয়েত, কাতার, দুবাই, সৌদি আরব, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, ইরাকসহ অন্যান্য দেশের প্রায় পনের হাজার মুসলি্লগণ অংশগ্রহণ করেন। এবছরও ১২-১৪ হাজার বিদেশী মুসলি্ল অংশগ্রহণ করবেন বলে পত্রিকাসূত্রে জানা যায়। বিভিন্ন পত্রিকার হিসাবে দুই পর্ব মিলিয়ে প্রায় ষাট থেকে সত্তর লাখ মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেন। এই বিশ্ব ইজতেমা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বেশ কয়েক মাস ধরে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সর্বস্তরের মানুষ পালাক্রমে মাঠ প্রস্তুতের কাজে অংশগ্রহণ করে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আল্লাহর অশেষ কুদরতে পুরো ব্যাবস্থাপনা ব্যায় বহুল ও সময় সাপেক্ষ হলেও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পুরো কাজ সম্পন্ন হয় আলহামদুলিল্লাহ। প্রতি বছরই ইজতেমা শেষে হাজার হাজার জামাত দেশের অভ্যন্তরে ও সারা বিশ্বব্যাপী দাওয়াতী কাজের আঞ্জাম দেয়ার জন্য বের হন নিজের জান মালের কোরবানির দ্বারা। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভাবগাম্ভীর্যময় আবেগ তৈরি করে আধ্যাত্মিক প্রেরণা উদ্বেলিত করে। বিশ্ব ইজতেমা তাবলীগ জামাতের বার্ষিক মহাসম্মেলন হলেও সর্বস্তরের মুসলমান, যারা বছরের অন্য কোনো সময় তাবলীগ জামাতের কাজে ও কাফেলায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না তারাও স্বতস্ফূর্ত এই বার্ষিক জমায়েতে শামিল হন।

শেষ কথা, বিশ্বশান্তির বিস্তৃত এ ঈমানী উদ্যানে শরিক হয়ে মানুষ জীবনের পাথেয় অর্জন করে। দ্বীনি শিক্ষা, বিশুদ্ধ ইলম, কালেমা, নামাজ, মাসলা-মাসাইলসহ ইত্যাদি শিখতে পারে। এবারের ইজতেমা সফল হোক, হোক হিদায়াতের উৎস।

এহসান বিন মুজাহির : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






Related News

Comments are Closed