বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোল দিয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল যে খেলোয়াড়ের
: প্রতি চার বছর পরপর আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব বিশ্বকাপ ফুটবল। যে আয়োজন ধর্ম-বর্ণ, জাত, যুদ্ধ, সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সব কিছু ভুলে একই সুতোয় গাঁথে শুধু মানুষকে। আর মানুষ যে কতটা ফুটবলপ্রেমী তা বোঝা যায় বিশ্বকাপের সময় নিজের সমর্থন করা দল নিয়ে তর্কে জড়াতে দেখলেই।
১১ জুন ২০২৬, শুরু হয়েছে প্রতিবারের মতো ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। এবারের মতোই ১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে রোমাঞ্চ, উন্মাদনা, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। তবে ১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এক গভীর ট্র্যাজেডি। যা আজও ফুটবল বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেয়। সেই ট্র্যাজেডির নাম আন্দ্রেস এস্কোবার। কলম্বিয়ার এই ডিফেন্ডার শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন একজন ভদ্র, শান্ত ও দায়িত্বশীল মানুষ যার জীবন শেষ হয়ে যায় এক ভুলের নির্মম পরিণতিতে।
আন্দ্রেস এস্কোবার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৭ সালের ১৩ মার্চ, কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মেডেলিনে। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এস্কোবার ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। রাস্তার ধুলো-মাটি থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্লাবের মাঠ সব জায়গাতেই ছিল তার ফুটবলের প্রথম পাঠ। তিনি ছিলেন শান্ত স্বভাবের, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং পড়াশোনাতেও ভালো। কিন্তু ফুটবলই ধীরে ধীরে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
তার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয় কলম্বিয়ার ক্লাব আতলেতিকো নাসিওনাল দিয়ে। দ্রুতই তিনি দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার নেতৃত্বগুণ, ট্যাকলিং দক্ষতা এবং খেলার প্রতি নিবেদন তাকে জাতীয় দলে জায়গা করে দেয়। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে তিনি কলম্বিয়া জাতীয় দলের অংশ ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে একজন স্থিতিশীল ডিফেন্ডার হিসেবে পরিচিত করেন।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার ওপর প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে তারা তখন শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু থেকেই দলটি চাপের মধ্যে পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের এক ম্যাচে ঘটে সেই ভয়াবহ মুহূর্ত আন্দ্রেস এস্কোবারের আত্মঘাতী গোল। ম্যাচটি কলম্বিয়া ২-১ গোলে হেরে যায় এবং টুর্নামেন্ট থেকে তাদের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে এটি খেলার খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এমন অপ্রত্যাশিত নানান ভুলে খেলায় হেরে যায় অনেক দল। তবে এই একটি ভুল বদলে দেয় পুরো গল্প। দেশে ফিরে এস্কোবার হয়ে ওঠেন ক্ষোভ, হতাশা এবং সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু। ফুটবলের মাঠের ভুল যেন সমাজের একাংশের কাছে অপরাধে পরিণত হয়। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মাত্র ১০দিন পর, ১৯৯৪ সালের ২ জুলাই, মেডেলিন শহরে এক নাইট ক্লাবের বাইরে এস্কোবারকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলাকারীরা গুলি করার সময় প্রতিটি গুলির পর ‘গোল!” বলে চিৎকার করেছিল। যেন ফুটবলের ভুলকে মৃত্যুদণ্ডে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনা শুধু কলম্বিয়া নয়, পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। পরে অবশ্য হামবার্তো কাস্ত্রো মুনিজ নামে একজন মাদকচক্রের দেহরক্ষী এই হত্যার দায় স্বীকার করেন। আদালত তাকে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দিলেও মাত্র ১১ বছর পর তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।
আন্দ্রেস এস্কোবারের মৃত্যু ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি। এটি শুধু একজন খেলোয়াড়ের মৃত্যু নয়, বরং খেলাধুলা, সমাজচাপ এবং সহিংসতার ভয়াবহ সংযোগের প্রতীক। এক মুহূর্তের ভুল কীভাবে একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, এস্কোবারের গল্প তার নির্মম উদাহরণ।
তার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে কলম্বিয়া সরকার ও ফুটবল সংস্থাগুলো সহিংসতা ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে আরও মানবিক ও নিরাপদ করার আলোচনাও জোরদার হয়। আজও কলম্বিয়ায় এস্কোবারকে ‘এল কাবাল্লেরো দেল ফুটবল’ বা ‘ফুটবলের ভদ্রলোক’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তার কবরের পাশে আজও ভক্তরা ফুল রেখে যান। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং এক সতর্কবার্তা যেখানে খেলা কখনোই জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে না। আন্দ্রেস এস্কোবারের গল্প তাই শেষ হয় না; এটি বারবার মনে করিয়ে দেয় ফুটবল আনন্দের জন্য, ঘৃণার জন্য নয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ

বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোল দিয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল যে খেলোয়াড়ের
প্রযুক্তির যেসব জাদু থাকছে এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চে
‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’র পুরস্কার পেলেন খালেদা জিয়াসহ ৬ নারী
পানি সংরক্ষনের উপায়
‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসুচীতে গাজীপুরের পাঁচ জয়িতা
ধন্যবাদের দেশে
ঝিনাইদহের অধিকাংশ নদ-নদী সংস্কারের অভাবে এখন মরা খাল,দেখার যেন কেউ নেই!
গাজীপুরে বাড়িয়া গণহত্যা দিবস 