ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হতে যাওয়া চুক্তি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু বছর ধরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে যে তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, এই চুক্তি সেই তিন ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রথমত, নেতানিয়াহু নিজেকে বরাবরই ওয়াশিংটনের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করতেন, মার্কিন রাজনীতিকদের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তার মতামতের গুরুত্ব আছে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা প্রক্রিয়ায় তাকে প্রায় পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
দ্বিতীয়ত, ইরানকে মোকাবিলা করাই ছিল নেতানিয়াহুর নিরাপত্তানীতির কেন্দ্রবিন্দু। বহু বছর ধরে তিনি ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি এমন এক পরিস্থিতিতে হচ্ছে, যেখানে অনেকের মতে ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে ইরানবিরোধী কঠোর নীতির সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বা ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তারক্ষক’ হিসেবে। তবে আগামী সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পক্ষ থেকে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করার যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা তার সেই ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- যে নেতা নিজেকে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতম মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতেন, তিনি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে এতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন?
ইরানবিরোধী কৌশলেই ধাক্কা: নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান অঙ্গ ছিল ইরানকে মোকাবিলা করা। তিনি বহু বছর ধরে ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন ও কঠোর অবস্থানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ শেষে ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটিকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন শর্ত মেনে নিয়েছে তা বোঝা কঠিন। তার মতে, লেবাননে কী ঘটবে, সে বিষয়ে ইরানের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তেহরানকে আবারও হিজবুল্লাহর ওপর প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ করে দেওয়া। এতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্ব- কেউই সন্তুষ্ট নয়।
নতুন নিরাপত্তা সংকট: চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধ রাখতে হবে। এর অর্থ, ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সীমিত করতে হতে পারে। এ বিষয়টি নেতানিয়াহুর জন্য নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। এটি এমন একটি চুক্তি, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। নেতানিয়াহুর নিজ দল লিকুদের সংসদ সদস্য আরিয়েল কালনারও বলেছেন, ইসরায়েল নিজেদের সুরক্ষার জন্য যা প্রয়োজন, তা-ই করবে। তার বক্তব্য, মিত্রদের মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে, তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে আপস করা হবে না।
বিরোধীদের আক্রমণ: সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ বলেন, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। একটি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া, যা ইসরায়েলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যটি হলো- মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করা। লাপিদের ভাষায়, নেতানিয়াহু এখন এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন, যেখানে তাকে হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক সংঘাত বেছে নিতে হবে, নয়তো ইসরায়েলের স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে।
‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে: দশকের পর দশক ধরে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ভাবমূর্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি আক্রমণাত্মক নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করেন। তার লক্ষ্য ছিল গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক চাপ বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়া। কিন্তু প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ ও ব্যাপক সামরিক অভিযান সত্ত্বেও হামাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। গাজার বড় অংশ ধ্বংস হলেও সংগঠনটি এখনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় মোতায়েন থাকায় সামরিক বাহিনী ও রিজার্ভ সদস্যদের ওপরও চাপ বাড়ছে।
ইরানের অবস্থান কি আরও শক্তিশালী? : বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটির কট্টরপন্থি নেতৃত্বকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেছেন, ইসরায়েলের ব্যর্থতার পর তেহরানকে ঘিরে তাদের কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। আরও বাস্তবসম্মত ও সংযত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, চুক্তি ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল যদি কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয় ও ওয়াশিংটন সেটিকে সেইভাবে দেখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে।
নীরব নেতানিয়াহু: চুক্তি ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও নেতানিয়াহু নিজে এখন পর্যন্ত খুব বেশি মন্তব্য করেননি। সাধারণত সামরিক বা কূটনৈতিক সাফল্যের কৃতিত্ব দ্রুত দাবি করলেও এবার তার নীরবতা অনেকের নজর কেড়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি এখন এমন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাকে শত্রুর নয়, বরং সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। যদি ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটত, তাহলে হয়তো তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি এমন এক দ্বিধার মধ্যে আটকে গেছেন, যেখানে সামনে রয়েছে শুধু দুটি পথ- সংঘাত অথবা সমঝোতা। সূত্র: বিবিসি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে শঙ্কিত ইসরায়েলিরা
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে ইরানকে ২০ বিলিয়ন ডলার দিচ্ছে আরব আমিরাত
যাবজ্জীবন সাঁজা পাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের ৩০ বছর জেল
আজাদ কাশ্মীরে সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ২২
জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে ইরানের হামলা
৩ দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা মিসাইল হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে-ইরানের স্পিকার 