শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের অন্তরায় কোচিং বাণিজ্যে: জিম্মি শিক্ষার্থী ও অভিভাবক |
সাগর কর্মকার,
শুধুই পড়া আর পড়া! নেই কোনো বিনোদন-খেলাধুলা, আনন্দ-ফুর্তি। টিভি দেখারও সময় মেলে না। বাসায় একের পর এক শিক্ষক আসছেন, পড়াচ্ছেন। সঙ্গে স্কুলের ক্লাস ও কোচিং। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে হোমওয়ার্ক শেষ করা আবার বাধ্যতামূলক। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়ই পড়ালেখা। কোমলমতি শিশুদের সর্বোচ্চ ভালো ফল অর্জন করাতে এমনই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতেছেন অভিভাবকরা। সার্টিফিকেট শিক্ষিত অবিভাবকরা তার সন্তানকে রেজাল্ট বানানোর মেশিন ভাবছেন। বাড়তি বই, বাড়তি কোচিং ও বাড়তি শিক্ষকের ধকল সামলাতে গিয়ে শিশুরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাদের শৈশব। তবুও পড়াশোনার বাড়তি চাপ থেকে তাদের মুক্তি মিলছে না। সারা দেশে কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভালোভাবেই জানে। বর্তমান সময়ে কোচিং এর সাথে সম্পর্ক নেই এমন শিক্ষার্থী খুজে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।কোচিংয়ের নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতিসহ নানা অনৈতিক কার্যকলাপ চলে। অনেক শিক্ষক কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়ায় ভালোভাবে ক্লাস নেন না। স্কুলের শিক্ষকরা ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যেতে প্রলুব্ধ করছেন। যেসব শিক্ষার্থী কোচিং করে না পরীক্ষায় তাদের নম্বর কমিয়ে দেওয়া হয় এমনটাই অভিযোগ করছে অবিভাবকরা । কোচিংবাজ শিক্ষকদের কাছে অসহায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কোচিং করাতে সহায়তা করছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকরা। এর বিনিময়ে তাঁরা কোচিংবাজ শিক্ষকদের কাছ থেকে মাসোয়ারা পাচ্ছেন। অনেক স্কুলে কোচিং করানোর জন্য শিক্ষকদের কাছে ক্লাসরুমও ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।
দেশের গড়পড়তা প্রায় সব স্কুলেই একটি কক্ষে ৫০ থেকে শুরু করে ৭০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থীর এক সঙ্গে ক্লাস হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজ শুধু পড়া দেওয়া এবং দু-চারজনকে তা ধরা। একটি বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলা, দুর্বল শিক্ষর্থীদের বাড়তি যত্ন নেওয়া, কঠিন বিষয়ে বেশি সময় দেওয়ার রীতি কোনো স্কুলেই নেই। ক্লাসের সময় ৪৫ মিনিট। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের খুব সামান্য অংশই বোঝাতে ব্যয় করেন শিক্ষক। বোর্ডে দু-একটি অঙ্ক করে দেখানো, রিডিং পড়া ও কোচিং এর কাজ দেওয়াতেই সময় চলে যায়।
কোচিং বাণিজ্য আজ এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামগঞ্জেও। এটি বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষফোড়ার আকার ধারণ করেছে। অনেকে মনে করেছিলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির প্রচলনে কোচিং বাণিজ্য নিরুৎসাহিত হবে; কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতিতে কোচিং আরো জেঁকে বসেছে। এখন স্কুল কর্তৃপক্ষই ভালো রেজাল্টের অছিলায় নিজেরাই স্কুল কোচিং চালু করেছে। স্কুল শেষ করে আবার কোচিং। এটা অনেকটা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য। পিইসি ও জেএসসিতে ভালো ফল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন স্কুল স্কুলের ভেতরেই কোচিং চালু করেছে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ তো বাড়ছেই । শিক্ষার্থীরা শুধু স্কুলে যাওয়া-আসা করে আর পরীক্ষা দেয়। পড়াশোনা করতে হয় প্রাইভেট আর কোচিংয়ে। ব্যাচভিত্তিক অ্যাকাডেমিক কোচিং, মডেল টেস্টসহ বিভিন্ন স্টাইলে কোচিং করাচ্ছেন শিক্ষকরা। প্রশাসনের নজরে না পড়তে কোচিং সেন্টারের কোনো নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না। ব্যাচভিত্তিক সপ্তাহে তিন দিন পড়ালেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের বেতন ৮০০ টাকা হলেও প্রাইভেট-কোচিংয়ে অভিভাবকদের ব্যয় করতে হয় আট থেকে ১০ হাজার টাকা। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে স্কুলের শিক্ষকদের পকেটেই যায় অতিরিক্ত এই টাকা।অভিভাবকদেরও বাড়তি পয়সা গুনতে হচ্ছে।প্রতিটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের এভাবে কোচিংয়ের ফাঁদে ফেলছেন শিক্ষকরা।
সার্টিফিকেট শিক্ষিত অভিভাবকরা স্কুলের থেকে কোচিংকে গুরুত্ব বেশি দিচ্ছে ।কারন বর্তমানে সংখ্যা গরিষ্ঠ কোচিং সেন্টার পরীক্ষায় আসা প্রশ্নপত্র পরীক্ষার কয়েক দিন আগে বইয়ে দাগিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।আর অবিভাবকরা এই কারনেই কোচিং করাচ্ছে সন্তানের বেশি নম্বরের আশায়।সে ক্ষেত্রে পরীক্ষায় নম্বর বা ফলটাই হয়ে ওঠে মুখ্য, সন্তান কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণ করছে তা নিয়ে যেন কারো মাথা ব্যথা নেই। আমাদের বোঝা উচিত শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শুধু পাসের হার ও উচ্চতর গ্রেডই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নয়, পাশাপাশি নৈতিক মানসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য।
বাস্তবতা হচ্ছে কোচিং নিষিদ্ধ থাকলেও তা থেমে নেই। সরকার যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্লাসে ভালোভাবে পড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এমনিতেই কোচিং নিরুৎসাহিত হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকদের হতে হবে শিক্ষার্থীর প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল। দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি দিতে হবে বিশেষ দৃষ্টি।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার স্বার্থেই কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে।বর্তমান বাস্তবতায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি ও অভিভাবকদের সক্রিয় তৎপরতা থাকলে থেকে সব ধরনের দুর্নীতি, অপতৎপরতা ও কোচিং ব্যবসায়ের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, বৈষম্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে কোচিং ব্যবসা ও শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করতেই হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ভিনদেশি অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ রোধে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে সব সামাজিক ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ববিতে আসন বেড়েছে ৫০টি, থাকছে না জিপিএ নম্বর
সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শিথিল
আগামী ৬ নভেম্বর এইচএসসি পরীক্ষা
স্কুল ও কলেজের সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন
আবদুল গাফফার চৌধুরী আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে রইবেন: উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান
সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় নির্ধারণ
রোজায় সব স্কুল-কলেজ খোলা থাকছে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত
আগামী ২০ মার্চ থেকে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু 